রেজি নংঃ ডিএ ১৩৬৩ | শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:১৮ অপরাহ্ন


একটি জাতি যখন অবক্ষয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন তার শিল্পকলায় দেখা দেয় স্থবিরতা। শিল্পীরা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না। তাদের কাজ কেবলই পুরনো বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া। কবিরা দিক্ভ্রান্ত ও হতাশা আক্রান্ত হন, তারা নিজেদের ভেতরে ও বাইরে কোথাও সৃজনশীলতার প্রণোদনা খঁুজে পান না। ফলে দেখা যায়, নৈরাজ্য ও অবক্ষয় কে উপজীব্য করে কাব্য রচিত হলেও তা খুব একটা মানসম্মত হয়ে উঠতে পারে না। কবিতা চিরকাল সুন্দরের পক্ষে, সত্যের পক্ষে। তাই সমাজে যখন অসত্যের বেসাতি চলে, ধান্ধাবাজির রাজত্ব কায়েম হয়, তখন সে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আদশের্র সম্মানিত প্লাটফমির্ট অটুট ও দৃঢ়মূল না থাকলে কবিতা কোথায় গিয়ে দঁাড়াবে? কাব্য পলকা জিনিস নয়। তাই সে কোনো অশক্ত ভিত্তির ওপর নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে না। সুদীঘর্কাল আমাদের সামনে কোনো আদশর্ নেই। আছে আনুষ্ঠানিকতা, গলাবাজি, শঠতা ও মসৃণ চালাকি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোকিল হত্যার ষড়যন্ত্র। আদশর্হীন পরিবেশ মূল্যবোধের নিদারুণ অকালে কলাবৃক্ষ শিকড় থেকে পযার্প্ত রস পায় না। আবার নেতি ও নৈরাশ্যের সামাজিক চিত্র মানবচিত্তকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, মানুষের সুকুমার বৃত্তিসমূহ পরিচযির্ত ও বিকশিত হয়ে উঠতে পারে না। তাহলে কবিতা বাঁচবে কীভাবে? কবিতা তো সমুদয় শিল্পকলার মধ্যে সবচেয়ে স্পশর্কাতর সবচেয়ে পরিবেশনিভর্র সৃষ্টি। আমরা, যাদের বয়স পঞ্চাশ ও ষাটের মাঝামাঝি, ছেলেবেলায় অসংখ্য রূপকথার গল্প পড়েছি। ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ থেকে আরম্ভ করে সুকুমার রায়ের সরস গল্প, আজব ছড়া ও নানা স্বাদের কিশোর উপন্যাস কেড়ে নিত আমাদের সময়। ২৫-৩০ বছর আগেও জেলা শহরের সাধারণ পাঠাগারগুলোতে শিশুদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষ ছিল। কৈশোরে দেখেছি, আন্তঃমহল্লা ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগ হচ্ছে…। পাড়ায় পাড়ায় যেমন নাচ, গান, নাটক ছিল, তেমনি ছিল বই বিনিময়ের উষ্ণতামাখানো সোনালি সব বিকেল। মাত্র দু’আড়াই দশকের ভেতর পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর পাঠকগুলো ফঁাকা হয়ে গেল। একসময় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছিল জুড়ো কারাতে ক্লাব। শরীরচচার্টাও যদি ঠিকমতো থাকতো আমরা সান্ত¡না পেতাম এই ভেবে যে, সুস্থ দেহ সুস্থ মন তৈরিতে সাহায্য করবে। এখন খুব সামান্য সংখ্যক ছেলেমেয়ে ‘জিম’-এ যায়। বেশির ভাগই যাচ্ছে নেশার স্বপ্নময় টানেলে! আমাদের চোখের সামনেই পুরো একটা প্রজন্ম প্রথমে হেরোইনসেবী পরে ইয়াবাখোর হয়ে গেল! রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ হয়ে গেল মিথ্যুক, ব্যবসায়ীরা ডাকাত আর আমলারা ষড়যন্ত্রকারী। কবিতা লেখার বা বোঝার জন্য যে বিশেষ পদ্ধতিতে গঠিত মন, যে ধরনের স্বপ্নকাতরতা প্রয়োজন, আজ তার অভাব প্রকট সবর্ত্রই। ফলে এখন শুধু কবিতার পাঠক নেই (আশঙ্কাজনভাবে কমে গেছে) তা নয়, কবিও নেই। অজস্র অকবিতার ভিড়ে প্রকৃত কবিতাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কাব্যচচার্কারী ব্যক্তিমাত্রই তো আর কবি নন। কবি কেউ কেউ। এই ‘কেউ কেউ’-রা আবিভ‚র্ত হন তখনই যখন রাষ্ট্র ও সমাজে অস্তিত্বশীল ন্যায় অন্যায়য়ের মধ্যকার দ্ব›েদ্ব ভারসাম্য থাকে। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য, আমরা সেই অতি প্রয়োজনীয় ভারসাম্যটুকু হারিয়ে ফেলেছি আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এখন শুধুই ধু-ধু মরুভ‚মি। একটিও মরুদ্যান নেই। নিবেদ ও নিরাশা অতিক্রম করার মতো প্রেরণাপ্রদ একটি বড় আলোও নেই আশপাশে। কবিতা কিন্তু কারও কারও জীবনে ওই আলোর সন্ধান দেয়।

বৈষয়িক উন্নতি এবং শৈল্পিক উন্নতির মধ্যে প্রধান পাথর্ক্যই হলো, প্রথমটির সঙ্গে টাকা-পয়সা সরাসরি সম্পকির্ত এবং অথর্-কড়িই এখানে মুখ্য। দ্বিতীয়টির সঙ্গে অথোর্পাজের্নর ধারণা সম্পৃত্ত নয়। সম্পৃক্ত মনের প্রশান্তির। তবে শিল্পকলাও পযার্প্ত টাকা-পয়সা এনে দিতে পারে, দেয়; এ মনটি আমরা অনেকবার দেখেছি। কিন্তু এ যুগে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, শিল্পকলার নিষ্কলুষ এলাকাটিও নানারকম বিষয়বুদ্ধি দ্বারা কলুষিত হয়ে চলেছে। যে নবীন শিল্পী তার প্রতিভা ও অধ্যবসায় খাটিয়ে বিরাট সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারেন, তাকেও আমরা টাকা-পয়সার জন্য ঘন ঘন ছোট মাপের কাজ, যেমন বইয়ের প্রচ্ছদ, করতে দেখি। কবি-শিল্পীদের জন্য এ এক অরুন্তদ সময়। তারা অনেকেই ভদ্রভাবে বঁাচতেই পারছেন না; মন ঢেলে কাজ করবেন কীভাবে?

আধুনিক কবিতা তার প্রতীকধমির্তা, পরোক্ষভাষণ ইঙ্গিতপ্রিয়তা ইত্যাদি কারণে জনসাধারণের সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি আজও। সাধারণ পাঠক এসব বোঝে না। তারা বোঝে সাদামাঠা উচ্চারণ, পরিচিত উপমা, সহজ সাবলীল অন্ত্যমিল ইত্যাদি। সেজন্য এও দেখা যাচ্ছে যে, দু’চারজন বৃদ্ধ কবি তাদের পূবর্তন ইমেজ কাজে লাগিয়ে খুব তরল ও স্থূল পঙ্ক্তিমালা লিখে চলেছেন ওই সস্তা জনপ্রিয়তা এবং নগদ প্রাপ্তির লক্ষ্যেই। এ কথার অথর্, করিবাও এখন কথা-সাহিত্যকসুলভ জনপ্রিয়তার কাঙাল। অথচ কবিতা যাকে ঋরহবংঃ ভড়ৎস ড়ভ ধৎঃ বলা হয়, তার যাবতীয় কলা-কৌশল নিয়েই ঐশ্বযর্বান। গরিব কিন্তু সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে কবিতা দঁাড়িয়ে থাকে, অন্তত থাকতে সচেষ্ট হয়, সমস্ত প্রতিক‚লতার মধ্যেও।

স্বাধীনতার পর এ দেশে কবিতার একটা হঠাৎ জোয়ার এসেছিল। ওই জোয়ারে জন্ম হয়েছে ষাটের একাধিক কৃতী কবির। গোটা সত্তরের দশক এবং আশির দশকের মাঝামাঝি এমনকি ১৯৮৮-৮৯ সাল পযর্ন্ত কাব্যগ্রন্থের বিক্রি-বাটা মোটামুটি ভালো ছিল। তখন পযর্ন্ত বেশ খানিকটা পরিচিতি আছে এ রকম কবির নাম সমাজে শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারিত হতো। তার সামাজিক ভাবমূতির্রও আজকের মতো নাজুক ছিল না। আজকে বাজারে অনেকগুলো দৈনিক, মাসিক পত্রিকা। এখন কাব্যগ্রন্থ তেমন বিক্রি না হলেও পত্রপত্রিকায় কবিতা বিক্রি করে দু’পয়সা উপাজর্ন করা যায়। কেবল পাওয়া যায় না কবির ইমেজ। তার কারণ কবির ইমেজ তৈরি হয় যুগপৎ কবি-পাঠক ও অকবি-পাঠকের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে। দেশে বুদ্ধিবৃত্তির চচার্ আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। কবিতা লেখেন না কিন্তু আধুনিক কবিতা মোটামুটি বোঝেন ভালো কবিও মাজারি মানের কবির মধ্যকার পাথর্ক্য টের পান এমন পাঠকের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। তদুপরি অবস্থাটা এমনই যে, কবিরাও কবিদের লেখা খুব একটা পড়েন না। পরিচিতি আছে এরকম পঞ্চাশোধ্বর্ কয়েকজন কবিকে চিনি যাদের গৃহে বই-পুস্তক নেই বললেই চলে। আমাদের প্রথম যৌবনে কবিতার যে অকবি পাঠকরা ছিলেন, তারা হয় জৈবনিক ব্যস্ততার কারণে কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কিংবা পড়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন না বলে কাব্যবিমুখ হয়েছেন। যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, বুঝতে হবে এই দুগির্তর জন্য কবিরাও কম দায়ী নন। কবিদের সামনে আজ কোনো ভরসা নেই। কোনো পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস বা অবলোকনের পটভ‚মি নেই। তাদের শৈল্পিক উচ্চাকাক্সক্ষা মৃত। দৃষ্টির খÐতা, ভাবনার ক্ষুদ্রতা ও কল্পনার অস্বচ্ছতার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ কবিরাই দীঘর্কাল ধরে কেবল বাকচাতুযর্ভরা (অনেকক্ষেত্রে তা-ও নেই) শূন্যগভর্ পঙ্ক্তি লিখে চলেছেন। জীবন এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল। লোকে এসব কেন পড়বে যদি না এর মধ্যে তারা প্রতিফলিত হতে দেখে ব্যক্তিমানুষের দুরারোগ্য বিষাদ, বিরক্তি, প্রশান্তি কিংবা তিমিরঘেরা আশা? কাজেই এত কবিতা দিয়ে আমরা কি করব? এসব অনগর্ল শব্দের কুচকাওয়াজ কি অথর্বহন করে/ জীবনের কোনো আকাক্সক্ষা, আনন্দ, অতৃপ্তি, হাহাকার তুলে ধরছে এসব রচনা; আদৌ কি তুলে ধরতে পারছে? কারা পড়ে এসব কবিতা? আদৌ কি পড়ে? না কি শুধুই কবির ও কবিতাটির নাম একপলক দেখে?

সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই কেবল মহৎ কবিকল্পনার জন্ম দিতে পারে। আর উঁচুমানের কবিতার জন্য প্রয়োজন ঋষিসুলভ নিলিির্প্ত। শ্রেয়বোধ এবং মানসিক ও বহিজার্গতিক শৃঙ্খলার চেতনার সঙ্গে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণভাবনার প্রতিস্মিকতা মিলিত হলেই কেবল সম্ভব উচ্চাকাক্সক্ষী কবিতা রচনা করা। বতর্মানের দিগন্তবিসারী অবক্ষয় ও অমানিশার ভেতর থেকেও সেই অজর শিল্পের প্রেরণা আসতে পারে যদি কবি অজর্ন করতে পারে সাধকের শ্রদ্ধতা ও সহিষ্ণুতা। কিন্তু সেটা বিরল সাধনার ব্যাপার। জাতির এই রাহুগ্রস্ততা একদিন নিশ্চয় কেটে যাবে। তখন নতুন প্রজন্মের মানুষ ফিরে তাকাবে স্বদেশের শিল্প-সংস্কৃতির দিকে। সেদিন যাতে ছোট না হতে হয় সে জন্য সমস্ত বাধা, উপেক্ষা, ঈষার্ অস্বীকৃতির তোয়াক্কা না করে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। প্রতিদানের জন্য হা-পিত্যেস নয়, বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্যসৃষ্টি। আর এ ক্ষেত্রে নিরলস সৃজনশীলতার কোনো বিকল্প নেই।

Share on Facebook Share on Twitter

আরও পড়ুন

photo of me

প্রকাশক ও সম্পাদক: এ্যাডঃ শেলী সুলতানা
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: বিএম ফরহাদ হোসেন

প্রকাশক কার্যালয়: ৫৭১, পুর্ব কাজীপাড়া,
মিরপুর, ঢাকা -১২১৬

বার্তা কক্ষ: +৮৮ ০২৯০৩০৬৭৫

ইমেইল : editor@modhusanda24.com
বার্তাকক্ষ : modhusanda.bd@gmail.com

© 2019 All Rights modhusanda24.com

Design & Developed By:

Top